রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের চাকা গড়ায় ক্ষমতা বদলের সঙ্গে তাল রেখে

রাজ্যে বিধানসভার ভোট যতই এগিয়ে আসছে শাসক দল তৃনমূল কংগ্রেসের দুর্বৃত্তায়ান ততই বাড়ছে | দলের মধ্যে গোষ্ঠী কোন্দলে খুন হয়ে যাওয়াটা এখন প্রতিদিনের ঘটনা | রাজ্যের নেতাদের কথা জেলার নেতারা শুনছেন না | আবার জেলার নেতাদের কথা নিচুতলার দলীয় কর্মীরা পাত্তাই দিচ্ছেন না | দলের মধ্যে খুনোখুনি আরও বাড়বে নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের টিকিট বিলির সময় | চোখ বন্ধ করে বলে দেওয়া যায় ২৯৪ টি আসনের প্রায় প্রতিটিতেই তৃণমূলের এক বা একাধিক গোঁজ প্রার্থী থাকবেই | তৃণমূলের নেত্রী এসব জানেন বলেই আগেভাগে ঘোষণা করেছেন যে প্রার্থী একমাত্র তিনিই মনোনয়ন করবেন | জেলার নেতারা প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে কমপক্ষে সুপারিশ টুকুও করতে পারবেন না | কোনো গণতান্ত্রিক দলে এই রকম ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা মতেই সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ নয় | ইন্দিরা গান্ধী ঠিক যেমনভাবে কংগ্রেসকে গান্ধী পরিবাবের ক্রীতদাসে পরিনত করেছেন, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ঠিক সেইভাবেই দলকে ব্যক্তিগত ক্রীতদাস বানাতে চাইছেন |

সিপিএম থেকে দল বদল করে আসা লুম্পেনরাই এখন তৃনমূল নেত্রীর গর্বের কারণ | সম্প্রতি রেড রোড কান্ডে দুর্বৃত্ত সাম্বিয়া, তৃনমূল নেতা মহম্মদ সোহরাবের ছেলে | সাম্বিয়ার বিয়ের পার্টিতে তৃণমূলের ছোট-বড় নেতাদের উপস্থিতি নজর কেড়েছিল এলাকার মানুষের | সেই ভোজ খেয়ে যাওয়া ন্যাতারাই এখন মহম্মদ সোহরাবকে চিনতে পারছেন না | বীরভূমের খয়রাশোলে স্থানীয় তৃনমূল নেতা শেখ সইফুল খুন হয়ে যাওয়ার ঘটনায় সিপিএম থেকে তৃণমূলে আসা লুম্পেনরাই জড়িত আছে বলে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হয়েছে | এই জেলারই ময়ূরেশ্বর থানায় হামলা চালিয়ে পুলিশ পেটানোর ঘটনায় শাসক দলেরই মুখ পুড়েছে | কারণ, ওই ঘটনায় হামলাকারীরা সবাই তৃনমূলের সমর্থক এবং কর্মী | আর সকলেই মুসলিম |

তবে সবচেয়ে ভয়ের এবং আশঙ্কার কারণ ব্যাপক বাংলাদেশী অনুপ্রবেশ | সম্প্রতি হুগলি নদীর ধরে রায়চকের কাছে কুকড়হাটিতে একটি ইটভাটা থেকে ৫১ জন বাংলাদেশীকে গ্রেফতারের ঘটনা রাজ্যের পুলিশ প্রশাসনকে উলঙ্গ করে দিয়েছে | সল্টলেকের উপনগরী রাজারহাটকে ঝাঁ-চকচকে স্মার্ট সিটি করার কাজ চলছে | এর নির্মানকাজে যুক্ত শ্রমিকদের ৮০% বাংলাদেশের লোক | ঠিকাদারদের বক্তব্য বাংলাদেশী শ্রমিকরা অনেক কম মজুরিতে কাজ করে | পুলিশ নজর এড়িয়ে (?) এত বিপুল সংখ্যক বাংলাদেশী শ্রমিকের উপস্থিতি তাদের ব্যর্থতাকেই তুলে ধরছে | কোনো কাগজ ছাড়াই বর্ডার পেরিয়ে বাংলাদেশীরা চলে আসছে এত ভিতরে, কিন্তু পুলিশ বা সীমান্তে কর্মরত বিএসএফ কিছু জানতেই পারছেনা সেটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় | আসলে এসবই তৃনমূল নেত্রীর তোষণের ফল | মনে আছে গতবারের বিশ্ব-বঙ্গ সম্মেলনের উদ্বোধনী ভাষণে উল্লেখ করা “চিপ লেবার” ? নিঃসন্দেহে পশ্চিমবঙ্গ এখন অনুপ্রবেশকারীদের স্বর্গরাজ্য | তৃণমূলের মাফিয়াদের হাতেই এখন পশ্চিমবঙ্গের রাজনীতি |

মালদহের কালিয়াচকের সাম্প্রদায়িক হাঙ্গামার ঘটনা তৃণমূলের রাজনীতির দুর্বৃত্তায়নের ভয়ংকর চেহারা মালদহের মানুষকে চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে |

কালিয়াচকের দুর্বৃত্তায়নের শুরু বাম আমলে মোজমপুর-নারায়নপুর থেকে | মোজমপুরের মাথা ছিল সিপিএমের আসাদুল্লা বিশ্বাস | নারায়নপুরের মাথা ছিল কংগ্রেসের তুহর আলী | এলাকা দখলের লড়াইতে খুন হয়ে যায় তুহর আলীর ছেলে | অভিযোগ ওঠে আসাদুল্লার বিরুদ্ধে | ইতিমধ্যে রাজ্যে ক্ষমতার পালাবদল ঘটেছে | সুযোগ বুঝে তৃণমূলে ঢুকে পড়ে আসাদুল্লা আর তার অনুগামীরা | গত পঞ্চায়েত ভোটে সিপিএমের শক্ত ঘাঁটি মোজমপুর আসাদুল্লার হাত ধরে তৃনমূল হয়ে যায় | আসাদুল্লার ভয়ে অধিকাংশ গ্রাম পঞ্চায়েতে বিরোধীরা প্রার্থী দেওয়ার সাহস দেখায়নি | আসাদুল্লা কালিয়াচকের ১৮ টা গ্রাম পঞ্চায়েতের বেতাজ বাদশা হয়ে যায় | কালিয়াচক থানাকে সে ব্যক্তিগত বৈঠকখানা বানিয়ে ফেলেছে | একাধিক খুনের ঘটনায় সরাসরি জড়িত হলেও পুলিশ থানায় বসে থাকা আসাদুল্লা কে খুঁজে পায় না, কারণ “দিদি যার মমতা – তাকে ছোঁয় কার ক্ষমতা ?”

কালিয়াচকে দাঙ্গা হাঙ্গামা, থানা পোড়ানো, হিন্দুদের দোকান লুঠ ইত্যাদি অপরাধে যাদের নাম উঠে এসেছে সেই কেতাবুদ্দিন, আসাদুল্লা, বকুল শেখ, রুকু শেখ, জাকির শেখরা সকলেই সিপিএম ছেড়ে তৃনমূল হয়েছে | এই লুম্পেনরাই কালিয়াচক-সুজাপুরে সমান্তরাল প্রশসন চালাচ্ছে | পুলিশের হাত-পা শুধু বাঁধা নয় তাদের হাত পা বেঁধে জলে ফেলে রেখেছে মমতা দিদি | দুর্বৃত্তরা সকলেই মালদহের প্রভাবশালী মন্ত্রীর ছত্রছায়ায় রয়েছে | তৃনমূল নেত্রী বিশ্বাস করেন যে এই দুর্বৃত্ত লুম্পেনরাই দলকে ভোটে জেতাবে | একদা সিপিএম এই দুর্বৃত্তদের দিয়ে ভোটে জিতত | আর এখন সেই দুর্বৃত্তদের ভয়ে প্রাণ বাঁচাতে ইঁদুরের গর্তে ঢুকে পড়েছে | একই পরিনতি অপেক্ষা করছে তৃণমূলের জন্য | কারণ রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের চাকা গড়ায় ক্ষমতা বদলের সঙ্গে তাল রেখে |

সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের মুনুষের কাছে এখন দুটো অপশন আছে | ১) দেখে শেখা ২) ঠেকে শেখা |
প্রশ্ন হলো কিরকমভাবে শিখতে আপনি আমি পছন্দ করি |

Please follow and like us:
0

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *