দলহীন গনতন্ত্র : ড. মৃনালকান্তি দেবনাথ

গনতন্ত্র কিন্তু কোনো দল ছাড়া, কথাটা একটু আশ্চর্য্য লাগবে। আমি পলিটিকাল সায়েন্সের ছাত্র নই, আর কোনো রাজনৈতিক দলের কাছে আমার মাথাটা বিক্রী করে দেইনি । হয়তো শুনে অবাক হবেন, আমার এই ৬৪ বছর বয়ষে আমি আজো ভোটের কালি হাতে লাগাইনি।

১৮ বছর বয়ষ যখন হয়েছে, তখন এমন এক জায়গায় থাকতাম যেখানে সি পি এম এর দৌরাত্ত্ব ছিলো বেশী। কংগ্রেস কে আমি কোনোদিন পছন্দ করিনা কারন, ওই দলটা আমার মাতৃভুমিকে ভাগ করেছে, আমার হাজার হাজার মা বোনের ইজ্জত নেবার ব্যাবস্থা করেছে, লক্ষ লক্ষ নিরীহ মানুষ কে ঘর ছাড়া করেছে। তাছাড়া বর্ত মানে ঐ দলটা দেশ বিরোধী এবং মানুষ বিরোধী নেতাদের আড্ডা খানা হয়েছে।

একসময় বামপন্থী প্রচারে ‘সিপিএম এর প্রতি একটা crush এসে পড়েছিলো, পাগলের মতো ছুটতাম জ্যোতি বসুর বক্তৃতা শুনতে। তারপর যখন আমার চোখ ফুটতে শুরু করলো, ভদ্রলোকের কলকাতার বাড়ির পাশে থাকে আমার এক বন্ধুর বাড়ীতে যাওয়া সুত্রে ওনার ব্যক্তিগত কীর্তি কাহিণী শুনলাম ,জানলাম এবং পরবর্তীতে নিজের মুক্ত চিন্তা দিয়ে যাচাই করে দেখলাম তখন আমার মোহ টুটে গেলো। নিজেকে ওনার এবং ওনার দলের প্রতি ভালোবাসার মোহ থেকে মুক্ত করলাম।

ওই সময় কংগ্রেস এবং সি পি এম ছাড়া কোনো সংগঠিত দল ও ছিলো না । ডাক্তারী পড়ার সময় দেখলাম, যারা ছাত্র পরিষদ করে , এস এফ এই, ডি ওয়াই এফ করে তারা ক্লাসে যায় না। কারন অনুসন্ধানে জানলাম, পাশ করে বেরিয়ে গেলে ছাত্র রাজনিতীর থেকে দূরে যেতে হবে আর তাহলে মুল দলে ঠিকানা যোগাড় করা মুশকিল। যতোদিন মুল দলে না ভেড়া যায় ততোদিন পরীক্ষায় ফেল করে বড়দরের রাজনিতীক হওয়া ভালো। বর্তমানে যারা রাজনিতী করে রোজ দল পাল্টাচ্ছেন (কংগ্রেস থেকে তৃনমুলে) তাদের মধ্যে চারজনকে জানি যারা লেখা পড়ায় লবডংকা। একজন যিনি ডাক্তার হয়েছেন তিনি আমাদের কলেজের না হয়েও দিনরাত আমাদের হস্টেলে পড়ে থাকতেন, বাকীরা ‘ল’ পড়তেন । এরা দেশের এবং দশের কতো ভালো করবেন তা আমি সেই থেকে জানি এবং বুঝে গেছি।

একবার ঠিক করলাম এবারে ভোট দেবো অবশ্যই। থাকতাম বাগুইয়াটির পাশে তেঘরিয়ায়। কংগ্রেস থেকে যিনি দাড়ালেন তিনি আমার রোগী, ভালো করে নাম সই করতে পারেন না, হাই ব্লাড প্রেসার এবং ‘ইস্কিমিক হার্ট ডিজিজ’ এ ভোগেন। একজন ভালো মানুষের সি পি এম থেকে দাড়ানোর কথা ছিলো-ভেবেছিলাম তাকে ভোট টা দেবো। কিন্তু রাতারাতি সব পালটে গেলো। যে দাড়ালো, সে এক নম্বরের অসভ্য লোক। মানুষের সঙ্গে ভালো করে কথা বলে না, ক্লাস ৫ পাশ, কিছু গুন্ডা নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, বাজার থেকে তরকারী বা মাছ কিনে পয়ষা দেয় না। দোকান দার ভয়ে চায় ও না। আমি আর ভোট দিতে গেলাম না। জিতে এসে ওই এম এল এ আমার ক্লিনিকে তালা ঝুলিয়ে দিলো , আর আমি বিদেশে পাড়ি দিলাম।

সামনে ভোট আসছে। হাবড়া থেকে কে বা কারা দাঁড়াবে জানিনা। আমি লোক দেখে ভোট দেবো। ভালো লোক না দাড়ালে কোনো মদো মাতাল, মেয়ে লোলুপ, গুন্ডা দলের সর্দার, তোলা বাজদের মদত কারী এইরকম কেউ বা দুদিন আগে এক দল করতেন আর আজ অন্য দলে ভিড়েছেন এমন কাউকে ভোট দিতে যাবোনা। জানি আমায় অনেকে বলবেন, গনতন্ত্রে ভোট নষ্ট করতে নেই, ‘নোটা’ তে দিন। কিন্তু ওই সমাজ বিরোধী দের ???? মনুষ্যত্ব হীন অমানুষ গুলোকে ??? নৈব নৈ ব চ। তাহলে ঈশ্বর আমায় ক্ষমা করবেন না, আমার নিজের বিবেকের কাছে আমি ছোট হয়ে যাবো।

গনতন্ত্রের নামে নিজের মাথাটা আমি কারো কাছে, কোনো দলের কাছে বিক্রি করতে রাজী নই। আমি একজন ভালো মানুষ কে আমার প্রতিনিধি করতে চাই। তা সে নির্দল হলেও।

বর্তমান ভারতে গনতন্ত্র কোথায় আছে বলতে পারেন???? সামান্য দুই একটা প্রদেশ বাদ দিলে দেশের প্রায় প্রতিটা কোনে দুটি তন্ত্র চলছে। পরিবার তন্ত্র না হয় ব্যক্তি তন্ত্র।আপনি কাশ্মীর থেকে কন্য কুমারিকা অবধি এক একটি প্রদেশ ধরে বিচার করুন দেখতে পাবেন সেই এক প্রথা। একটি পরিবার অথবা একটি ব্যক্তি যা বলবে সেটাই শেষ কথা। ভুলবেন না, এক নেত্রীর অসন্তুষ্টির কারনে ভারতের ‘রেল মন্ত্রী’ পদত্যাগ করতে বাধ্য হন বাজেট পেশের কয়েক মিনিটের মধ্যে। পৃথিবীর কোথাও শুনেছেন এই রকম ঘটনা-আমি তো শুনিনি।

ভারতের জাতীয় দল হিসাবে স্বীকৃতি প্রাপ্ত যে দল গুলি আছে তার মধ্যে সি পি এম এবং বিজেপি ছাড়া আর দল গুলির দিকে তাকান– কি দেখতে পাবেন???? দলের হাই ক্যমান্ড যা কিনা মাত্র দু তিনজনের এক গোষ্টি তারা ঠিক করে দেবে সারা দেশে কি ভাবে সেই দল চলবে। এটা কি সত্যিকারের গনতন্ত্র??? পলিটিকাল সায়েন্সের জ্ঞান যাদের আছে তারা কি বলেন–আমি তো অতো সতো বুঝিনা।

ভোটের আগে দরাজ হাতে ভোটারদের ঘুষ দিলে (সাইকেল, জুতো ইত্যাদি), পাড়ার ক্লাব গুলিতে লক্ষ লক্ষ টাকার অনুদান দিয়ে ছেলে পুলেদের মাথা কিনে নিলে, এই করবো সেই করবো বলে কিছু মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে গরীব মানুষ গুলোকে যাদু করে নিলে, সাধারন মানুষের শিক্ষার অভাব এবং পেটের চাহিদা থেকে জন্মানো লোভ কে সুড় সুড়ি দিয়ে যে গনতন্ত্রের দোহাই পাড়া হয় সেই গনতন্ত্রকে ‘মানুষের দ্বারা, মানুষের জন্য’ বলতে আমার বিবেকে বাধে। ভোটের আগের দিন রাতে এক বোতল দেশী মদ আর কিছু চাল ডাল বিতরন হয় কি হয় না??? হলে তা কি গনতন্ত্র?????

ভোটের আগের রাতে বাড়ীতে বাড়ীতে গিয়ে বিরোধী দলের মানূষ গুলোকে ভোট কেন্দ্রে যেতে বারন করা এবং গেলে তার পরিনাম কি হবে সেটা বলে দেওয়া, ভোটের দিন বুথ দখল করে ছাপ্পা দেওয়া যে গনতান্ত্রিক প্রথাকে আমরা বগল বাজিয়ে উচ্চ কন্ঠে বলি সেটা আর যাই হোক গনতন্ত্র নয়। বিদেশে থাকা কালীন, বিদেশী বলে ভোট দিতে পারিনি কিন্তু দেখেছি। আর সেই জন্য লজ্জা যেমন হয় ঘৃনা হয় তার থেকে বেশী।

আমি সমাজবিজ্ঞানী বা রাষ্ট্র বিজ্ঞানী নই। কিন্তু আমার সাদা মাথায় যেটুকু বুঝি তাতে আমি এই বদ্ধমুল ধারনায় এসেছি যে, দলহীন গনতন্ত্র সম্ভব এবং আমাদের দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে -, এই ব্যাক্তি তন্ত্র, গুন্ডা তন্ত্র বা পরিবার তন্ত্রের হাত থেকে রেহাই পেতে হলে সেটাই একমাত্র পথ। অন্যথায়, প্রয়োজন মিলিটারীর হাতে দেশটাকে ১০ বছরের জন্য ছেড়ে দেওয়া, যেটা কোনো স্থায়ী সমাধান নয়।

আমাদের দেশে বহু মানুষের মধ্যে এখনো প্রকৃত শিক্ষার অভাব আছে। দারিদ্রতাও অনেকের কাছে বড়ো বালাই। কিন্তু কে একজন ভালো মানুষ এবং কে তাদের কিছুটা ভালো করতে পারেন সেটা তারা ভালোই জানেন। সাধারন মানুষ আর কিছুই না বুঝুক প্রকৃত ভালোবাসা এবং প্রকৃত নিষ্ঠা টা ঠিকই বোঝে। কৃত্রিম দরদ আর ভন্ডামি বুঝতে খুব বুদ্ধি এবং সময়ের দরকার হয় না। উপায় নেই তাই “মন্দের ভালো” টাকে বেছে নেয়।

মানুষের ভালোবাসা এবং আস্থা পেতে হলে সেটা অর্জন করতে হয়। সারা পৃথিবীতে যারা সাধারন মানুষের আস্থা এবং ভালোবাসা পেয়েছেন তারা নিজ গুনে এবং কর্মে সেটা অর্জন করেছেন। সমাজের মধ্যে বহু শিক্ষিত এবং সজ্জন ব্যাক্তি এখনো আছেন । সমাজকে যদি রক্ষা করতে হয়, নিজে এবং অপরকে নিয়ে যদি সুস্থ ভাবে বাচার ইচ্ছা থাকে তবে সেই সমস্ত সজ্জন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা আছে এমন মানুষ এবং কি করলে সমাজ এবং মানুষের ভালো হয় তেমনি ব্যাক্তিদের এগিয়ে আসতে হবে। তবেই সমাজ বাচবে, সংসার বাচবে, মানুষ নিজেও বাচবে।

“সারা শরীরকে প্রতারনা করে শুধু মুখে রক্ত সঞ্চার করলেই তাকে স্বাস্থ্য বলে না”-(এটা আমার কথা নয়-বোধ হয় কবিগুরু রবীন্দ্রনাথের ;শহীদ তিতুমীর প্রবন্ধে লেখা-আমার ভুল হতে পারে, শুধরে দিলে কৃতজ্ঞ থাকবো)—এই কথাটা যেমন ঠিক, তেমনি এটাও ঠিক, সমাজের সুধী ব্যক্তিরা যদি নিজেকে নিজ স্বার্থ, যশ এবং পান্ডিত্যের বেড়াজালে আটকে রাখেন তাহলে সমাজ এবং দেশের মানুষের সবথেকে বেশী সর্বনাশ হয় এবং বর্তমানে তাই হচ্ছে।

আমাদের সমাজের সার্বিক অবক্ষয়ের মুলে এই অপদার্থ রাজনিতীকরা বা গুন্ডা গুলো নয়। ওদের হাতে সব ছেড়ে দিয়ে যে সুধীজন হাত গুটিয়ে নিজের গড়া এক অলীক সাচ্ছন্দ্যের জগতে বাস করছেন তারা। এরা চেচামেচি করেন তখনই যখন নিজেদের স্বার্থে আঘাত লাগে। বিবেক টাকে এরা বেচে দিয়েছেন,পারেন শুধু অন্যের দোষ দেখতে এবং দিতে। নিজেরা কিছুই করবেন না। যে সামাজিক প্রতিষ্ঠা এবং সাচ্ছন্দ্য এরা পাচ্ছেন এবং সাধারন মানুষের যে শ্রদ্ধাকে এরা নিজেদের অর্জিত বলে মনে করেন, সেটা আসলে ঈশ্বর প্রদত্ত, সমাজের কল্যানের জন্য, সেটাই এরা বেমালুম ভুলে যান। ক্ষমতাসীনের ভজনা করে একটি রাষ্ট্রীয় পুরষ্কার , নানা সভায় ক্ষমতাসীনের পাশে বা পিছনে সারিতে বসতে পারা, বা কোনো একটি সংস্থার মুখ্য প্রসাশকের পদ পেতে সদা ব্যস্ত এই ‘ভন্ড ভালো মানুষ’ গুলোই সমাজের জঞ্জাল। এরা সমাজ থেকে সব কিছুই নেবে দেবে না কিছুই। সব পাপিষ্ঠের গোষ্টি।

সাধারন মানুষ, খেটে খাওয়া মানুষ সর্বতো ভাবে সমাজকে পরিচালিত করতে পারে না। সর্বহারার ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন তাই পরিনত হয়ছে মাত্র গূটী কয়েক বা মাত্র একটি ব্যাক্তির খাম খেয়ালীতে ( কম্বোডিয়া, কিউবা, রুমানিয়া, ব্রিটিশ গায়ানা, উত্তর কোরিয়া, লাওস, গিয়ে দেখে আসুন সেখানে সর্বহারার শাসন প্রতিষ্ঠার নামে কি অমানুষিক কাজ পল পট, ফিদেল ক্যাস্ত্রো, কচেষ্কূ,বারনহাম, কিম উল সুং করেছে এবং করে চলেছে। (একমাত্র উত্তর কোরিয়া বাদে আর সব দেশ গূলোতে আমি নিজে গিয়ে দেখে এসেছি এবং আজো মাঝে মাঝে যাই)

সমাজকে সুষ্ঠ ভাবে, সাম্য ভাবে, মানবিক ভাবে পরিচালিত করতে চাই নিতীনিষ্ঠ, প্রকৃত ভাবে শিক্ষিত, সজ্জন এবং বুদ্ধিমান ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলাদের মানুষের কল্যানে এগিয়ে আসা। আজ ভাববার সময় এসেছে যে পাশের বাড়ীর খেটে খাওয়া মানুষ টা যদি ভালো থাকে তবেই নিজে ভালো থাক যায়। নইলে পাশের বাড়ীর ওই লোকটা তোমাকে হয়তো ভালো থাকতে দেবে না।

‘আমার ছেলে মেয়েটা দুধে ভাতে থাকুক আর পাশের বাড়ীর ছোট বাচ্চা টা না খেতে পেয়ে কাদুক’ এটাতে শান্তি নেই, সুখ নেই, এটা সবার বুঝতে হবে। যারা বোঝে না তাদের বোঝানোর জন্য এগিয়ে আসতে হবে তাদেরই যাদের সব কিছু আছে (বুদ্ধি, সচ্ছলতা, শারিরীক দক্ষতা এবং সদিচ্ছা)। শুধু মুখের কথায়, কিছু হলে মোমবাতির মিছিল করে, খবরের কাগজে নিজের মুখ টা ওঠে কিনা সেটা নিশ্চয় করে, এ সি ঘরে বসে লোকের দুঃখ, কষ্ট সব দূর করার ভাবনা অলীক এবং লোক ঠকানোর ব্যবসা ছাড়া আর কিছুই নয়। এই ব্যবসা বন্ধ না হলে সমাজ গোল্লায় যাবে এবং যাচ্ছে।

ব্যাক্তি নিয়ে সমাজ, সমাজ নিয়ে দেশ। সমাজ তৈরী হয় সেই সমাজের প্রতিটি মানুষের কাজ কর্ম, ভাবধারা, চিন্তা শক্তির উতকর্ষ দিয়ে। এক দেশে একের বেশী সমাজ থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সমাজ গুলো নিজেকে যেমন সঙ্ঘটিত করবে তেমনি নিজ নিজ সমাজকে দেশের সেবায় বিলিয়ে দেবে, এটাই মনুষ্যত্বের নিয়ম। এক সমাজ আর এক সমাজের সংগে লড়বে এটা হতে পারে না, তাতে দেশ ধ্বংস হয়ে যায়। একটি সমাজের মানুষ যেমন খেয়াল রাখবে নিজ সমাজের সব মানুষ সুস্থ স্বাভাবিক ভাবে মনুষ্যত্বের বিকাশ ঘটাতে পারে, ঠিক তেমনি খেয়াল রাখবে তারা এমন কোনো কাজ কর্ম করবে না যাতে ভিন্ন সমাজের মানুষের নিজ নিজ কাজে কোনো বাধার সৃষ্টি হয়। কোনো সমাজ বা সেই সমাজের কোনো ব্যাক্তি নিজের মত অন্যের ওপর চাপিয়ে দেবার কথা বলবেও না কোনো চেষ্টাও করবে না। সমাজ সৃষ্টির এটাই মুল উদ্দেশ্য এবং মানবিক নিয়ম। এই নিয়মের ব্যত্যয় হলে সমাজ দেশ ধ্বংস হয়ে যায়, পরিশেষে সেই ভাবে এক বিরাট প্রলয় হয়। কারন প্রকৃতি তার কোনো নিয়মের প্রতিকুল অবস্থা বেশিদিন সইতে পারে না। সংঘাত তৈরী হবেই এবং সেই সংঘাত অবশ্যই মানুষের সার্বিক ধ্বংস টেনে আনবে। মানুষ সমাজ তৈরী করবে কোনো দল বা উপদল তৈরী করবে না। করলেই নানা সংঘাত অবশ্যম্ভাবি।

মানুষকে তাই নিজ নিজ সমাজ তৈরীতে মন দিতে হবে। সমাজ এক মানুষের গোষ্টি আর সেই গোষ্টিতে কোনো দন্ধ বা বৈষম্য থাকবে না। থাকলেই সেই সমাজ টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। যে বৈষম্য মানুষকে বেশী করে অসামাজিক তৈরী করে সেটা হলো মানুষ হিসাবে বেচে থাকার ন্যুন্তম প্রয়োজন মেটার ব্যবস্থা না থাকা। শুধুমাত্র ধার্মিক চিন্তা ভাবনা, ধর্মীয় উন্মাদনা কোনো সমাজের মানুষের মানবিক চাহিদা মেটাতে পারে না। ধর্মীয় নিয়ম কানুন যখন মানুষকে তার নির্দিষ্ট গন্ডীর মধ্যে বেধে রাখার চেষ্টা করে তখন সেই ধর্ম নিজেকে শেষের দোড় গোড়ায় এনে দাড় করিয়ে দেয়।

ধর্ম মানুষ কে পথ দেখাবে কি ভাবে প্রকৃত মানুষ হওয়া যায়। মানুষের জীবনের জৈবিক চাহিদা এবং শারীরিক চাহিদা কিভাবে একটী সার্বিক সাজুয্যের মধ্য দিয়ে মেটানো যায়। সেই পথ সঠিক হলে এবং সমাজের প্রতিটি মানুষ যখন সেই পথটা জানে এবং নিষ্ঠার সংগে অনুসরন করে তখনই সমাজে উন্নতি ঘটে। ধর্মকে বাদ দিয়ে কোনো সমাজ হয় না, কারন মানুষ কিছুতেই মানবিক গুন লাভ করতে পারে না ধর্মকে না জানলে বা না মানলে।

ক্যমুনিজম ঠিক এই কারনেই মানুষের কল্যান করতে ব্যর্থ হয়েছে। ক্যমুনিষ্ট মতবাদের সব থেকে বড়ো ভুল মানুষ কে শুধু মাত্র একটী জীবের মতো ভাবা, যার শুধু প্রয়োজন ‘আহার নিদ্রা আর মৈথুন’ নামে তিনটি জৈবিক ক্রিয়ায় পারদর্শী হওয়া । ভুল, সেটা সম্পুর্ন ভুল। আর সেই ভুলের মাশুল চোকাতে হয়েছে কোটি কোটি মানুষকে। ধর্ম কে বাদ দিয়ে সমাজবাদ হয় না, হবেও না কোনো দিন।

যে মানুষের জীবন ধার্মিক চিন্তা ভাবনা এবং তার নির্দিষ্ট পথ অনুসরন করে না, সে মানুষই হতে পারে না, তা কি করে মানুষের কাজে লাগবে????? সমাজ তৈরী করতে হলে, সমাজের মংগলের জন্য কাজ করতে হলে তাই আগে নিজেকে প্রকৃত মানুষ হিসাবে তৈরী করতে হবে। একটি রাজনৈতিক দলের সভ্য হয়ে সেই কাজ হয় না।

সমাজবাদ যেমন ব্যর্থ হয়েছে, ঠিক তেমনি ব্যর্থ ধনতন্ত্র। প্রচুর অর্থ হলেই মানুষ সুখী হয়, ভালো থাকে এটাই মানুষের জীবনের এক চরম প্রহেলিকা। আর্থিক সচ্ছলতা আর আর্থিক প্রাচুর্য্য এই দুটি ব্যপার এক নয়। অতিরিক্ত অর্থ মানুষকে বিকৃত মনের হতে বাধ্য করে। সে হয়ে পড়ে প্রচন্ড স্বার্থন্বেষী এবং সত্য পথ থেকে বিচ্যুত। ভালো ভাবে বেচে থাকতে মানুষের প্রচুর অর্থের প্রয়োজন হয় না। ভোগের মাধ্যমে যেমন ত্যাগী হওয়া যায় না (আচার্য্য রাজনীশকে স্মরন করুন), তেমনি প্রচুর অর্থ দিয়ে শারীরিক আরাম আয়েস কেনা যায় কিন্তু মানসিক শান্তি কেনা যায় না । যে ধন অপরের কাজে লাগে না সে ধন অশান্তির কারন হয়। প্লেটো সে কথা বলে গেছেন, সনাতন ধর্ম আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়।

বেশীর ভাগ মানুষ যারা প্রছুর অর্থ লাভ করে সেটা বেশীর ভাগ সময় অন্য কে ঠকিয়ে লাভ করা, সে যেভাবেই হোক। মানুষকে ঠকিয়ে মানুষ শান্তির আশা করতেই পারে না। প্রচুর অর্থ মানুষকে ভোগ বাদী জীবনে অভ্যস্ত করে দেয়, আর সেই ভোগতৃষ্ণা কিছুতেই মেটে না। এই ভোগতৃষ্ণা আজকের সমাজকে সার্বিক ধ্বংসের পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছে যার পদধ্বনি আমরা শুনতে বা দেখতে পাচ্ছি আমাদের দৈনন্দিন জীবনে।

চারিদিকে অশান্তি- ঘরে স্বামী স্ত্রীতে, বাবা মায়ের সংগে সন্তানের, ভাই বোনের সংগে। বাইরে প্রতিবেশীর সংগে, সহকর্মীর মধ্যে, প্রেমিক প্রেমিকার সংগে, এক দলের সমর্থকের সংগে অপর দলের, এক ধর্মের সঙ্গে অপর ধর্মের। অশান্তির আর বাকী রইলো কি ?? মুল কারন কি?? ভোগ তৃষ্ণায় বাধা পড়া। ভালোবাসা আমাদের জীবন থেকে মুছে যাচ্ছে এই অদমনীয় ভোগ তৃষ্ণা থেকে। (শ্রী গীতার দ্বিতীয় অধ্যায়ের ৬১ এবং ৬২ নম্বর শ্লোক পড়ুন বা আমার লেখা “মানুষের দুঃখ এবং অশান্তির কারন” পড়ুন)। যে মতবাদ বা বস্তু মানুষের ভিতরকার দানবীয় প্রবৃত্তি জাগায় সে মতবাদ আর যাই হোক মানুষের কোনো উপকারে লাগে না। ধনতন্ত্র মানুষের মনের সেই দানবীয় প্রবৃত্তিকে সুড়সুড়ি দিয়ে জাগিয়ে তাকে অমানূষ করে তোলে।

ব্যক্তি সাতন্ত্র্যর নামে আর এক অমানবীয় চিন্তার সৃষ্টি হয়েছে। প্রতিটি মানুষ একে অন্যের থেকে আলাদা। এটা আমার জীবন, আর এটাকে নিয়ে আমি যা খুশী তাই করবো, যা খুশী তাই বলবো, কে আমার কি করবে, কেউ কিছু বললে সে আমার বিরোধী এবং আমার শত্রু। আমি যেন তেন প্রকারেন, সত্য মিথ্যার বালাই না করে আমার যশ, খ্যতি, প্রতিপত্তি এবং শারীরীক সুখ মেটানোর সব কিছু করবো, কারো কিছু বলার নেই করার নেই- এই মত হলো চার্বাক ঋষির। চারু বাক= চার্বাক। তিনি বলেছিলেন “ঋনং কৃত্যা ঘৃতং পিবেত”– ঘি খাবার জন্য ঋন করতে হলেও করো ।

নাম, যশ, ক্ষমতা , ভোগলিপষূ এই মানুষ গুলো আজ আমাদের সমাজ দাপিয়ে বেড়াচ্ছে। তাদের বিকৃত মানসিকতার পরিতৃপ্তির জন্য নানা দল গড়ছে, উপদল গড়ছে। সমাজের যে ধর্মীয় অনুশাসন সেটাকে উপড়ে ফেলে, ভন্ডামি করে , সমাজের ছোট বড়ো, সবাইকে মিথ্যের ঘোল খাইয়ে, সাধারন মানুষের মাথায় কাঠাল ভেঙ্গে খাচ্ছে। সাধারন মানুষের নানা দুর্বলতাকে সুক্ষ্ম ভাবে ব্যবহার করে এরাই হচ্ছে মুখ্যমন্ত্রী, মন্ত্রী, এম পি, এম এল এ। সমাজের সম্পদকে নিজেরা লুটে পুটে নিয়ে, সম্ভোগী জীবনের ক্ষুধা মেটাচ্ছে। কিন্তু সমাজের এই সম্পদ সমাজকে সুষ্ঠ ভাবে ফিরিয়ে দেওয়ার যে শপথ বাক্য এরা পাঠ করে সেটাকে বেমালুম ভুলে গিয়ে, সাচ্চা রাজনীতিকের ভড়ং করে বেড়ায়। সমাজ গোল্লায় যাক, মানুষ গোল্লায় যাক, আমি আর আমার পরিবার পরিজন তো রোজ ঘি খাই-এটাই এদের একমাত্র ধ্যান জ্ঞান এবং নিত্য দিনের কর্ম।

এরা সবাই ওই চার্বাক ঋষির অনুসরনকারী। প্রাচীন কালে দেব গুরু বৃহষ্পতি চার্বাকের মতবাদ ধ্বংস করেছিলেন। আজকের যুগে সেই গুরু বৃহষ্পতির বড়ো অভাব পড়ে গেছে।

Please follow and like us:
0

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *