জোট মানেই ভোট নয় – কংবামতা

কথায় বলে, দুর্জনের নাকি ছলের অভাব হয় না৷ বামেদের সঙ্গে জোটের পক্ষে প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি অধীর চৌধুরী (একদা সিপিএমের চোখে যাঁর মতো দুর্জন আর কেউ ছিলেন না ) যে খাসা একটি তত্ত্ব বাজারে ছেড়েছেন তার চেয়ে বড় ছলনা বা আত্মপ্রবঞ্চনার দৃষ্টান্ত আর কিছু হতে পারে কি ?অধীরের মতে, সিপিএম যদি দীর্ঘদিন এই বাংলায় ‘পলিটিকস অব ডমিনেশন’ করে থাকে তাহলে তৃণমূল শুরু করেছে ‘পলিটিকস অব অ্যানিহিলেশন’৷ অতএব নিকেশের রাজনীতির হাত থেকে পরিত্রাণ পেতে সিপিএমের প্রভুত্বের রাজনীতির পদতলে কংগ্রেসের আত্মসমর্পণের সময় এসেছে৷ আপনি বাঁচলে তবে তো বাপের নাম ! কংগ্রেসের মা-বেটা অধীরের এই অদ্ভুত তত্ত্বকে কতটা গুরুত্ব দেবেন, বলতে পারব না৷ তবে ঐতিহাসিক সত্যটা হল বাম জমানায় সিপিএমের হাতে যত কংগ্রেসি নিকেশ হয়েছে তার বাত্সরিক গড়পড়তা হিসেবটি তৃণমূল জমানার বাত্সরিক গড়পড়তা হিসেবের চেয়ে বহুগুণ বেশি৷ রাজ্য কংগ্রেসে প্রায় একা কুম্ভ হয়ে একলা চলার প্রবক্তা মানস ভুঁইঞা এই কথাটাই বেশ কিছু দিন ধরে বলে আসছেন৷ অতএব প্রশ্ন, যে অধীর এই সেদিন পর্যন্ত নিজের জেলায় সিপিএমের যাবতীয় অত্যাচারের বিরুদ্ধে সরব হতেন তিনি হঠাত্ ‘পলিটিকস অব অ্যানিহিলেশন’-এর অভিযোগ থেকে বামেদের এ ভাবে মুক্তি দিতে চাইছেন কেন ? এমন ছেঁদো যুক্তি খাড়া করে লোক হাসানোর কোনও অর্থ হয় কি ?

এই জমানায় কংগ্রেসের সমস্যার চরিত্রটি ভিন্ন৷ তা হল রাষ্ট্রের ক্ষেত্রে কার্ল মার্কস একদা যে ভবিষ্যদ্বাণীটি করেছিলেন তৃণমূলের জমানায় এ রাজ্যে কংগ্রেসের হাল অনেকটা সেই রকম৷ মানে ‘উইদারিং অ্যাওয়ে অব দ্য অর্গানাইজেশন’৷ ১৯৯৮ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কংগ্রেস ভেঙে নতুন দল গড়ার অব্যবহিত পরেই দক্ষিণবঙ্গ থেকে কার্যত মুছে গিয়েছে কংগ্রেস৷ কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূলের দিকে চলে যাওয়ার এই প্রবণতাটি বিপজ্জনক আকার নিয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পরে৷ দক্ষিণবঙ্গে যেখানে যে কয় জন পাতে দেওয়ার মতো কংগ্রেস নেতা আছেন তাঁদের সবাইকে এক এক করে তৃণমূল গ্রাস করেছে, থাবা বসিয়েছে ভাগীরথীর ওপারে আড়াইটে জেলায় কংগ্রেসের অবশিষ্ট দুর্গেও৷

উদহরণস্বরূপ অধীরের জেলা মুর্শিদাবাদের কথাই ধরা যাক৷ তিন-চার বছর আগেও এখানে কংগ্রেসের যে নিরঙ্কুশ বোলবোলা ছিল আজ আর তা নেই৷ কংগ্রেসের এক প্রভাবশালী প্রাক্তন সাংসদ দল ছেড়ে তৃণমূলে ভিড়েছেন, নিচু তলায় অনেক কংগ্রেস কর্মী চলে গিয়েছেন তাঁর সঙ্গে৷ একার মুরোদে তৃণমূল এখনও হয়তো মুর্শিদাবাদে কোনও আসন জেতার জায়গায় পৌঁছতে পারেনি, তবে কংগ্রেসের বাড়া ভাতে ছাই ঢালার মতো শক্তি অবশ্যই সঞ্চয় করে ফেলেছে৷ আসন্ন বিধানসভা ভোটে শেষ পর্যন্ত যদি চতুর্মুখী প্রতিদ্বন্দ্বিতা হয় তৃণমূলের কারণেই এই জেলায় গতবারে জেতা বেশ কয়েকটি আসন খোয়াবে কংগ্রেস, তার সুফল ঘরে তুলবেন বামপন্থীরা৷ এর অর্থ গোটা রাজ্যে চতুর্মুখী লড়াইয়ে যদি তৃণমূল দুই-তৃতীয়াংশ আসন জেতার জায়গায় থাকে তা হলে মুর্শিদাবাদ কিংবা মালদার মতো কংগ্রেস প্রভাবিত জেলায় ভোট ভাগাভাগির সুবিধে পাবেন বামপন্থীরাই৷ এই নিশ্চিত ভবিতব্যের জন্যই তৃণমূল অথবা বাম যে কোনও এক পক্ষের সঙ্গে কংগ্রেসের জোট বাঁধাটা বিশেষ জরুরি৷

কাগজে-কলমে কংগ্রেসের স্বাভাবিক মিত্র অবশ্যই কংগ্রেস৷ এই দুই দল আদতে একই বিষবৃক্ষের দুই প্রশাখা, একটি দৈর্ঘ-প্রস্থে বড়, অন্যটি ছোট ৷ ২০০১ থেকে এ পর্যন্ত একাধিক নির্বাচনে দুই কংগ্রেসের জোট হয়েছে, শেষবার হয়েছে গত বিধানসভার ভোটেই৷ তা হলে তৃণমূল সম্পর্কে রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের এমন বিবমিষা কেন ? কেনই বা রাহুল গান্ধীর সঙ্গে আলোচনায় উপস্থিত একজনও তৃণমূলের সঙ্গে জোটের পক্ষে মুখ খুললেন না ? বিষয়টি কিঞ্চিত্ কৌতূহলোদ্দীপক নয় কি ?আপাতদৃষ্টিতে দু’টি সম্ভাব্য কারণের কথা বলা যায়৷

এক) অতীতের অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের উপলব্ধি হয়েছে দুই কংগ্রেসের জোট হলে অবধারিতভাবে আসন বণ্টনের প্রশ্নে নিয়ন্ত্রণটি চলে যায় মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাতে, তাঁর তৈরি করা তালিকার তলায় ‘ডটেড লাইনে’ সই করা ছাড়া তাঁদের কার্যত কিছু করারই থাকে না৷ সেই তুলনায় বামপন্থীরা অনেক বেশি নমনীয় হবেন, তাঁদের সঙ্গে দর-কষাকষি করা যাবে অনেক বেশি৷

দুই) মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে প্রায় ‘প্যাথোলজিকাল’ ঘৃণা আছে এই সব কংগ্রেস নেতাদের৷ মমতার উত্থানের কারণেই এঁরা রাজ্য-রাজনীতিতে সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছেন, খবরের টেলিভিশন চ্যানেলগুলি না থাকলে অবধারিতভাবে এঁদের বেশিরভাগ হয়ে যেতেন বিস্মৃত চরিত্র৷ সেই কারণেই মমতাকে ক্ষমতাচ্যুত করতে এঁরা প্রয়োজনে শয়তানের সঙ্গেও হাত মেলাতে প্রস্ত্তত৷

কংগ্রেসি নেতাদের সঙ্গে এমন তিক্ততার সম্পর্ক তৈরি হওয়ার জন্য মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও তাঁর দায়িত্ব বোধ হয় অস্বীকার করতে পারেন না৷ হাজার হোক কংগ্রেসের সঙ্গে জোট বেঁধেই তিনি রাজ্যে ক্ষমতা দখল করতে পেরেছিলেন, গোড়ার দিকে কংগ্রেস তাঁর মন্ত্রিসভারও শরিক ছিল৷ কিন্ত্ত বিচ্ছেদের পরেও এই স্বাভাবিক মিত্র দলটির যে মর্যাদা পাওয়া উচিত ছিল তৃণমূল জমানায় কংগ্রেস অবশ্যই তা পায়নি৷ ক্ষমতায় থাকার সুযোগ নিয়ে এবং কিছু না কিছু পাইয়ে দেওয়ার লোভ দেখিয়ে মমতার পরোক্ষ প্রশ্রয়ে মুকুল রায় অ্যান্ড কোং যে ভাবে সর্বত্র কংগ্রেস সম্পর্কে আগ্রাসী মনোভাব দেখিয়েছে, দল ভাঙিয়েছে, রাজ্য কংগ্রেস নেতারা বলতেই পারেন, সেটা তাঁদের প্রাপ্য ছিল না৷ সেই কারণেই বিষিয়েছে সম্পর্ক, মমতা সম্পর্কে অন্ধ-বিদ্বেষ আচ্ছন্ন করেছে রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের৷ সেই কারণেই বরাবরের দুশমনি ভুলে গিয়ে তাঁরা চাইছেন মুখ্যমন্ত্রীকে সবক শেখাতে৷ ফলটাই তাঁদের কাছে একমাত্র বিবেচ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে পন্থাটা নয়৷ নইলে দল বেঁধে দিল্লি গিয়ে রাজ্য কংগ্রেস নেতারা সিপিএমের সঙ্গে জোটের পক্ষে সওয়াল করবেন কিছুদিন আগে পর্যন্ত এ রাজ্যে তেমন একটি সম্ভাবনা ছিল কল্পনারও অতীত৷ সংক্ষেপে এর অর্থ সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধীদেরও যে তাঁদের প্রাপ্য জায়গাটুকু ছেড়ে দিয়ে চলতে হয় সেই হক কথাটা তৃণমূল নেতৃত্ব বোঝেননি৷ সে জন্যই ভোটের মুখে তাঁরা সম্মুখীন হয়েছেন কংগ্রেসিদের এমন অপ্রত্যাশিত বিদ্বেষের৷

কংগ্রেসের সহ-সভাপতির সঙ্গে যে সব কংগ্রেসি নেতা বিধানসভা ভোট নিয়ে আলোচনা করেছেন সামান্য কয়েকজনকে বাদ দিলে তাঁরা বাকি সবাই ‘রুটলেস ওয়ান্ডারার’, টেলিভিশন স্টুডিওর বাইরে যাঁদের কোনও অস্তিত্বই নেই৷ বস্ত্তত এমন একটি শিকড়হীন নেতাদের সমাবেশ সচরাচর কোথাও দেখাই যায়না৷ এঁদের পারস্পরিক সম্পর্কও অনেক ক্ষেত্রে খারাপ, দলের অভ্যন্তরে নানা বিষয়ে এঁদের অবস্থান সম্পূর্ণ বিপরীত বিন্দুতে৷ একটিই অনুচ্চারিত বাসনা এঁদের ভোটের মুখে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এক সুরে কথা বলার তাগিদ জুটিয়েছে, যেন তেন প্রকারেণ রাজ্য রাজনীতিতে হারানো গুরুত্ব ও প্রাসঙ্গিকতা পুনরুদ্ধার করা৷ সিপিএমের পিঠে চাপলে সেটা যতটা সহজ, অন্য কোনও ভাবে ততটা নয়৷ এই আলোচনায় যে প্রশ্নটি প্রায় অনুচ্চারিত থেকে যাচ্ছে এবং যে প্রশ্নের জবাব এখনও অমীমাংসিত তা হল, কংগ্রেসের কয়েকজন শিকড়হীন নেতার ইচ্ছা-অনিচ্ছা আর কংগ্রেসি ভোটারের পছন্দ-অপছন্দ আদৌ সমার্থক কি না৷ কমতে কমতে এ রাজ্যে কংগ্রেসের ভোট তলানিতে ঠেকেছে ঠিকই৷ যেটুকু এখনও অবশিষ্ট আছে তাঁরা চিন্তায় যতটা জাতীয়তাবাদী হয়তো তার চেয়েও বেশি বাম-বিরোধী৷ ফলে যে রাজনৈতিক বন্দোবস্তে বামেদের ক্ষমতায় ফেরার উদ্যোগ অর্থবহ হয় তাঁরা তাকে সমর্থন করবেন কি না সেটাই মূল প্রশ্ন৷ অন্য ভাবে বলতে গেলে বামেদের সঙ্গে জোট হলেই রাজ্যের সব কংগ্রেসি ভোটার দু’হাত তুলে তার পক্ষে দাঁড়াবেন, দলে দলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে কোথাও কাস্তে-হাতুড়ি-তারা কোথাও আবার কোদাল-বেলচায় বোতাম টিপবেন সেই গ্যারান্টি কেউ দিতে পারে না৷ কংগ্রেসের ভোট বামেদের পক্ষে গেলে উত্তরবঙ্গে হয়তো লড়াইটা হবে সমানে-সমানে৷ কিন্ত্ত না হলে ? অতএব, জোট মানেই ভোট নয় কেননা ভোটার কোনও নেতারই কেনা গোলাম নয়৷

তবু উপর থেকে চাপিয়ে দেওয়ার চিরাচরিত বন্দোবস্ত থেকে সরে এসে কংগ্রেসের সহ-সভাপতি যে রাজ্য নেতৃত্বকে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিচ্ছেন, সেটা অবশ্যই কংগ্রেসের প্রায় অনুপস্থিত অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্রের পক্ষে শুভ লক্ষণ৷ পশ্চিমবঙ্গের ক্ষেত্রে সেটা যদি না ঘটে তা হলে বেজায় বিপন্ন দশা হবে কংগ্রেস নেতাদের৷ ভোটের মুখে তাঁদের মুখ পুড়বে, নিজেদের দলে তাঁদের ইচ্ছা-অনিচ্ছার মূল্য নেই, আদতে তাঁরা সবাই হাইকমান্ড নামক অদৃশ্য অরণ্যদেবের দাসানুদাস নতুন করে ফের প্রতিষ্ঠিত হবে সেই পুরোনো সত্যটাই৷ কী হবে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত, সম্পূর্ণ ভাবে তা নির্ভর করছে এখন সোনিয়া মাতার ওপর৷ রাজ্য কংগ্রেস নেতাদের প্রায় সর্বসম্মত দাবি তিনি যদি অগ্রাহ্য করেন তা হলে দলের সহ-সভাপতি হিসেবে নিজের পুত্রের অবস্থান এবং গুরুত্ব নড়বড়ে হয়ে যাবেই৷ সনিয়ার ‘না’ প্রমাণ করবে ছেলের রাজনৈতিক দূরদর্শিতা সম্পর্কে স্বয়ং মাতা-ই সন্দিহান৷ রাহুল খাল কেটে নিজের জন্যই কুমির ডেকে আনলেন না তো? সনিয়ার কিংকর্তব্যবিমূঢ়তার কারণ হবে একটাই৷ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পর্কে এ রাজ্যের কংগ্রেস নেতাদের বিদ্বিষ্ট মনোভাবের তিনি শরিক নন৷ বরং উল্টোটাই সত্য৷ শরিক হিসেবে বামেরা কতটা বিশ্বাসযোগ্য প্রথম ইউপিএ সরকারের তিক্ত অভিজ্ঞতার পরিপ্রেক্ষিতে সোনিয়া সেটা বিলক্ষণ জানেন৷ কংগ্রেস সভানেত্রীর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিচার করলে তাঁর কাছে এটা ‘ডেভিল’ আর ‘ডিপ সি’-র মধ্যে একটিকে বেছে নেওয়ার প্রশ্ন৷ বাছুন যাকেই সামনের পথটা ভয়ংকর হবেই ৷ দেখা যাক কংগ্রেসের মাতা কী করেন৷

এসব কিছুর পরেও একটা চিন্তা তো থেকেই যাচ্ছে, সেটা হলো, দলটা যে এখন আর ‘হোমেও লাগে না আর যজ্ঞে-এও লাগে না’ সেটা দলের ভোটাররা বুঝতে পেরে গেছেন | তার ওপর দলের এই ‘কাছা সামলাই না কোঁচা সামলাই’ অবস্থা দেখে ভোটাররা আবার চতুর্থ বিকল্পকে চেখে দেখার মনস্থির করবেন না তো ? সময় উত্তর দেবে |

Please follow and like us:
0

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *