কাঁঠাল বলে, আনারস …..তুই বড় খসখস

স্বাধীনতা পরবর্তী ভারতীয় রাজনীতিতে কংগ্রেস ও কমিউনিস্টদের ক্ষেত্রে দুর্নীতিটাই দস্তুর হয়ে দাঁড়িয়েছে | তবে এদের দুর্নীতির ধরন নিয়ে একটা রসিকতা রয়েছে | মাননীয় তপন ঘোষ মহাশয়ের কথায়… কংগ্রেস বা তৃনমূল কংগ্রেসও দুধ চুরি করে খায় আর কমিউনিস্টরাও দুধ চুরি করে খায় | কিন্তু তফাৎটা হলো এই যে, কংগ্রেস বা তৃনমূল কংগ্রেসরা দুধ খায় চুমুক দিয়ে, টানা হেঁচড়া করে (গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের মাধ্যমে), ফলে গোঁফে, মুখে লেগে যায় আর দিব্যি বোঝা যায় যে ব্যাটারা দুধ চুরি করে খেয়েছে | কমিউনিস্টরা চুরির দুধ খায় স্ট্র লাগিয়ে চুপিসারে, ফলে গোঁফে মুখে লাগার কোনো চান্স নেই | মানুষকে বোকা বানানোটাও সহজ হয়ে যায় |

সম্প্রতি সারদা থেকে নারদ, একের পর এক তৃণমূলী দুর্নীতির ঘটনায় এই রসিকতার তাৎপর্য বোঝা যাচ্ছে | কংগ্রেস-সন্তান তৃণমূলের যাবতীয় আর্থিক কেলেঙ্কারী ক্রমশ প্রকাশিত হয়ে পড়ছে বলে সিপিএম ধোয়া তুলসী পাতা এমন ভাবার কোনো কারণ নেই |

চৌত্রিশ বছর যখন তারা ক্ষমতায় ছিল তখন তাদের বিরুদ্ধে হাজারো আর্থিক দুর্নীতির অভিযোগ ছিল | আর এই অভিযোগ যে শুধু বিরোধীরাই করেছিল তা নয় – তৎকালীন জ্যোতি বসু সরকারের মন্ত্রী ও পরবর্তী সময় বামফ্রন্টের মুখ্যমন্ত্রী শ্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যও এই অভিযোগ করেছিলেন | “চোরেদের সরকারে থাকবো না” বলে ১৯৯৩ সালে মন্ত্রিত্ব ছেড়ে বেরিয়ে এসেছিলেন তিনি | পরে অবশ্য মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার চান্স দেখে আবার দলে ফেরৎ যান ও মুখ্যমন্ত্রী হন | প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী জ্যোতি বসুর পুত্র চন্দন বসু ছিলেন “বেঙ্গল ল্যাম্প”-এর সামান্য এক কর্মচারী | বামফ্রন্টের শিল্পনীতির সুবাদে সেই বেঙ্গল ল্যাম্পে লালবাতি জ্বলার পর কোম্পানির বাকি কর্মীদের যখন “ভাত” জোটানোই সমস্যা হয়ে গেছিল, তখন কোন মন্ত্রবলে চন্দন কোটি কোটি টাকার মালিক হয়ে গেলেন রাতারাতি ? প্রশ্নটা সহজ আর উত্তরও জানা | কিন্তু তখন নারদ নিউজ ছিল না | তাই স্টিং অপারেশনের শিকার হতে হয় নি চন্দনকে |

“সঞ্চয়িতা চিটফান্ড” – এর কথা সবার জানা | আজ সারদা নিয়ে যে ল্যাজে গোবরে হচ্ছে তৃনমূল সরকার, সেদিনকার বাম সরকারের কপালেও ওই একই জিনিস পাওনা ছিল না কি ? কিন্তু সিপিএমের অসাধারণ “ম্যান ম্যানেজমেন্ট” আর সেকালের মিডিয়ায় আজকের মতো সক্রিয়তার অভাব ছিল বলেই দলের নেতারা রেহাই পেয়ে যান |

রোজভ্যালি বলুন বা সারদা, সবের উত্থানের পেছনেই সিপিএমের “হাত” ছিল | পরে এইসব চিটফান্ডের কর্তারা সময় বুঝে জার্সি বদল করেছিল বটে | কিন্তু তাতে কি সিপিএমের দোষস্খালন হয়ে যায় ? হঠাত করে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ কি করে হয় সে তো সিপিএম নেতারাই তাঁদের জমানায় দেখিয়ে এসেছেন | আজকের তৃণমূলের তোলাবাজি শিল্প তো সিপিএম জমানার পরম্পরা মাত্র | কলেজে কলেজে এসএফআই-এর সদস্যরা কুপন কেটে রীতিমত তোলা তুলত (যার পোশাকি নাম অবশ্য ছিল চাঁদা বা অনুদান)| সিপিএমের এক কালের দোর্দন্ডপ্রতাপ নেত্রী সরলা মাহেশ্বরী আর তাঁর স্বামী অরুণ মাহেশ্বরীকে কি এত সহজেই ভোলা যায় ? যাঁরা তাঁদের গাড়ির চালক সন্তোষ মাহাতোর নামে পাঁচ বছরে তিনশ একর জমি কিনেছিলেন |

একশ্রেনীর সিপিএমের লোক জার্সি বদলালো তার পেছনে ক্ষমতা ধরে রাখার উদ্দেশ্য ছিল তাতে কোনো সন্দেহ নেই, কিন্তু, আরো একটা বড় কারণ ছিল আর সেটা হলো ধরা না পরার তাগিদ | এই দল বদলানো জার্সি বদলানো নব্য তৃনমূল নেতারা মানে প্রাক্তন সিপিএম কর্মীদেরই এখন দাপট চলে | তাই তাদের দুর্নীতিও অব্যাহত | জেলায় জেলায়, গ্রামে গ্রামে, নগরে নগরে সিপিএমের বিলাসবহুল পার্টি অফিস (যার বেশির ভাগই এখন তৃনমূল পার্টির অধীনে) তৈরী হয়েছিল সেগুলো নাকি কৌটো নাড়ার পয়সা দিয়ে হয়েছিল | ভিক্ষের টাকায় এত বিলাসিতা করা যায় নাকি ? বাম জমানায় আমাদের রাজনৈতিক চৌর্যবৃত্তির ট্রাডিশন তৈরী হয়েছিল, তৃনমূল জমানায় তাকেই সযত্নে লালন-পালন করা হয়েছে | ২০১২ সালের ১৭ থেকে ১৯ মার্চ বামফ্রন্টের 20 তম কংগ্রেসে স্বীকার করে নেওয়া হয় “যৌন হয়রানি”, “দুর্নীতি”, “আর্থিক অনিয়মতা” পার্টির মধ্যে বৃদ্ধি পেয়েছে |

যে দলের এককালের সর্বোচ্চ ব্যক্তি প্রকাশ করাত ও তাঁর স্ত্রী, পার্টির নেত্রী বৃন্দা করাত বছরে দুবার বিদেশে বিলাবহুল ছুটি কাটিয়ে আসেন পার্টির টাকায় পার্টির সর্ব ভারতীয় সাধারণ সম্পাদক থাকা কালীন; সে দলের আয়ের উৎস জানতে কি আমাদের ঔৎসুক্য হয় না ? বাটি নাড়িয়েই কি এত টাকা আয় করা যায় যে পার্টির সাধারণ হোলটাইমাররাও ফাইভষ্টার জীবন যাপন করতে পারেন ?

এদের দলীয় ব্যবস্থা নেওয়ার ধরনটাও পার্টির সদিচ্ছা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দেয় | যেমন ধরুন আরামবাগের প্রাক্তন সাংসদ অনিল বসুর কথা | যতদিন তিনি রিগিং, ছাপ্পা, হুমকি, বুথ দখল ইত্যাদি অপকর্মকে শৈল্পিক পর্যায়ে নিয়ে গিয়ে রেকর্ড ভোটে জিতেছিলেন ততদিন তিনি ছিলেন সৎ রাজনীতিক | কিন্তু যে মুহুর্তে সিপিএমের সুদিন ঘুঁচলো আর তিনি পার্টি লাইনের বিরুদ্ধে মুখ খুললেন, সঙ্গে সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে পার্টির নেতারা ঝুলি থেকে বেড়াল বের করে দিলেন | ২০১২ সালে এপ্রিলে তাঁকে সাসপেন্ড করা হলো দুর্নীতির অভিযোগে | লক্ষণ শেঠের কথাই বা ভুলি কি করে ?

সুতরাং, নৈতিকতার যে বুলি এখন সিপিএম আওড়াচ্ছে সেটা নেহাতই ক্ষমতায় ফেরৎ আসার উৎকন্ঠা ছাড়া আর কিছু নয় | একটা বাংলার প্রবাদ দারুন ভাবে মনে পড়ছে :

“কাঁঠাল বলে, আনারস তুই বড় খসখস”

Please follow and like us:
0

Be First to Comment

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *